এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বেশির ভাগ শেয়ারবাজার সূচকে গতকাল দেখা গেছে নিম্নমুখী প্রবণতা। যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর পতন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে এ অঞ্চলের বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সাবধানী অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে ওয়াল স্ট্রিটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতসংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলোর অতি মূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগ এবং বড় ব্যাংকগুলোর মুনাফা প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়া এশিয়া-প্যাসিফিকের পুঁজিবাজারে বড় প্রভাব ফেলেছে। খবর এপি।
জাপানের টোকিওতে গতকাল নিক্কেই ২২৫ সূচক দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। দিনশেষে সূচকটি স্থির হয় ৫৪ হাজার ১১০ দশমিক ৫০ পয়েন্টে। প্রযুক্তি খাতের অস্থিরতায় জাপানি বিনিয়োগকারী জায়ান্ট সফটব্যাংক গ্রুপের শেয়ারদর কমেছে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এছাড়া চিপ টেস্টিং সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডভানটেস্টের শেয়ারদরে ২ দশমিক ৫ শতাংশ পতন দেখা গেছে। তবে এ বাজারে ব্যতিক্রম ছিল খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান মুজি বা রিয়োহিন কেইকাকু। প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মুনাফা করার খবরে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। অন্যদিকে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটা মোটরের অধিগ্রহণ প্রস্তাবের মূল্য বাড়িয়ে শেয়ারপ্রতি ১৮ হাজার ৮০০ ইয়েন (১১৮ ডলার ৬১ সেন্ট) নির্ধারণের খবরে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান টয়োটা ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদর বেড়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ।
চীনের মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ের শেয়ারবাজারেও গতকাল দরপতন লক্ষ করা গেছে। হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক দশমিক ৩ শতাংশ কমে ২৬ হাজার ৯২৫ পয়েন্টে নেমেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও অনলাইন প্লাটফর্মগুলোর ওপর বেইজিংয়ের কড়াকড়িতে বিনিয়োগকারীরা নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। অ্যান্টিট্রাস্ট তদন্তের মুখে চীনা ট্রাভেল প্লাটফর্ম ট্রিপ ডটকমের শেয়ারদর হংকংয়ের বাজারে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এদিকে চীনা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিনিয়োগকারীদের জন্য মার্জিন রিকোয়ারমেন্ট বা আমানতের ন্যূনতম সীমা বাড়িয়ে দেয়ায় সাংহাই কম্পোজিট সূচক দশমিক ৩ শতাংশ কমে পৌঁছেছে ৪ হাজার ১১২ দশমিক ৬০ পয়েন্টে।
এশিয়া-প্যাসিফিকের অন্যান্য বাজারের মধ্যে তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতা টিএসএমসি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মুনাফার পূর্বাভাস দিলেও কোম্পানিটির শেয়ারদর ১ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা কোম্পানিটির বাড়তি মূলধনি ব্যয়ের পরিকল্পনাকে দায়ী করছেন। তবে এ অঞ্চলে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ছিল দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ৭৯৭ দশমিক ৫৫ পয়েন্টে স্থির হয়। অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স ২০০ সূচক দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৮৬১ দশমিক ৭০ পয়েন্টে।
এশিয়া-প্যাসিফিকের শেয়ারবাজারে পতনের মূল সূত্রপাত হয়েছিল আগের দিন ওয়াল স্ট্রিটের মন্দাভাব থেকে। বিনিয়োগকারীরা এখন ‘এআই উন্মাদনা’ থেকে কিছুটা সরে আসছেন। অতিমূল্যায়িত হওয়ার আশঙ্কায় বুধবার শীর্ষ চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার শেয়ারদর ১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ব্রডকমের দর ৪ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। ওয়াল স্ট্রিটে এদিন এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক দশমিক ৫ শতাংশ এবং প্রযুক্তিপ্রধান নাসডাক কম্পোজিট ১ শতাংশ কমেছে। যদিও ওইদিন শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া অধিকাংশ অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারদর ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে প্রযুক্তি জায়ান্টদের পতনে প্রধান সূচকগুলোয় ছিল নিম্নমুখিতা।
প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বল পারফরম্যান্সও বিনিয়োগকারীদের ভাবিয়ে তুলেছে। ওয়েলস ফার্গোর প্রান্তিক আয় ও মুনাফা প্রত্যাশার চেয়ে কম হওয়ায় কোম্পানিটির শেয়ারদর ৪ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। এছাড়া ব্যাংক অব আমেরিকা ও সিটি গ্রুপের শেয়ারদরেও বড় পতন দেখা গেছে। আর্থিক খাতের এমন শ্লথগতি বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় কিছুটা উদ্বেগ জাগিয়েছে। অনিশ্চয়তার এ সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা। ফলে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড কমে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে নেমে এসেছে।
মুদ্রাবাজারে ডলারের বিপরীতে ইয়েনের বিনিময় হার কিছুটা কমেছে। প্রতি ডলারের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১৫৮ দশমিক ৬৩ ইয়েনে। বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আসন্ন আর্থিক প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছেন।